জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সম্মেলনগুলো শুধু নীতি আলোচনার মাধ্যম নয়, বরং প্রযুক্তির উদ্ভাবনের প্ল্যাটফর্ম। ২০২৫ সালে, COP30 (বেলেম, ব্রাজিল), Climate Week NYC এবং ঢাকা জলবায়ু সম্মেলনের মতো ইভেন্টগুলোতে AI, IoT, ব্লকচেইন এবং গ্রিন টেকের উপর ফোকাস করা হয়েছে, যা নির্গমন হ্রাস, অভিযোজন এবং টেকসই উন্নয়নের পথ দেখাচ্ছে। COP30-এর মতো সম্মেলনে প্রযুক্তির আলোচনা ৪০% বেড়েছে, যা জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই অর্থনীতির সাথে যুক্ত। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি উচ্চ, এই আলোচনাগুলো স্থানীয় সমাধানের জন্য অনুপ্রেরণা।
এই লেখায় আমরা ২০২৫ সালের প্রধান সম্মেলনগুলোতে প্রযুক্তির আলোচনা, উদাহরণ, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এটি পরিবেশবিদ, নীতিনির্ধারক এবং তরুণ কর্মীদের জন্য উপযোগী।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত ৩০তম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন (COP30) প্রযুক্তির আলোচনায় একটি মাইলফলক। সম্মেলনে "প্রযুক্তি এবং ইনোভেশন" থিমে ফোকাস করা হয়েছে, যা জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের সাথে যুক্ত। আলোচনায় AI-এর ভূমিকা, IoT-চালিত জলবায়ু মনিটরিং এবং ব্লকচেইন-ভিত্তিক কার্বন ট্রেডিংয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
COP30-এর সাইড ইভেন্টে "Tech for Climate Action" সেশনে, WEF-এর সাথে যুক্ত প্যানেলে AI-এর মাধ্যমে জলবায়ু মডেলিং এবং প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিক্স নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা নির্গমন ১৫% কমাতে সাহায্য করতে পারে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে, AI-এর সাথে জলবায়ু সহনশীলতা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছে, যা উপকূলীয় বন্যা পূর্বাভাসের জন্য প্রাসঙ্গিক। সম্মেলনে "New Collective Quantified Goal (NCQG)"-এ প্রযুক্তি-ভিত্তিক অর্থায়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের ফান্ডিং তৈরি করতে পারে।
সেপ্টেম্বর ২১-২৮, ২০২৫ সালে নিউয়র্কে অনুষ্ঠিত Climate Week NYC 2025 প্রযুক্তির আলোচনায় একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। এটি বিশ্বের বৃহত্তম জলবায়ু ইভেন্টের একটি, যা ১০০০+ ইভেন্টে ১ লক্ষেরও বেশি অংশগ্রহণকারীকে আকর্ষণ করে। ট্রেন্ডসে "Tech for Climate Action" সিরিজে AI এবং IoT-এর উপর ফোকাস করা হয়েছে, যা জলবায়ু অ্যাকশনকে ত্বরান্বিত করার জন্য।
আলোচনায়, "Digital Innovation for Climate Resilience" সেশনে ব্লকচেইন-ভিত্তিক কার্বন ক্রেডিট ট্র্যাকিং এবং AI-চালিত স্মার্ট সিটিজ নিয়ে প্যানেল হয়েছে, যা নগরায়ণের সাথে জলবায়ু অভিযোজনের সাথে যুক্ত। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা, CPD-এর নেতৃত্বে, ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি এবং টেকনোলজি-ভিত্তিক অর্থায়ন নিয়ে অংশ নিয়েছে, যা দেশের ২০% জলবায়ু ফান্ডিংয়ের দাবি তুলে ধরেছে। এই সম্মেলনে "Youth Innovation Challenge" এ তরুণরা AI-ভিত্তিক জলবায়ু সমাধান উপস্থাপন করেছে, যা বাংলাদেশের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।
জুলাই ২৬, ২০২৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত "ঢাকা জলবায়ু সম্মেলন ২০২৫" প্রযুক্তির আলোচনায় ফোকাস করেছে, যার থিম ছিল "জলবায়ু পরিবর্তনে নগর জীবনে প্লাস্টিক দূষণ রোধে তরুণদের ভূমিকা"। সম্মেলনে IoT-ভিত্তিক প্লাস্টিক দূষণ মনিটরিং এবং AI-চালিত ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা শহুরে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রাসঙ্গিক।
তরুণ কর্মীরা প্রযুক্তি-ভিত্তিক সমাধান উপস্থাপন করেছে, যেমন মোবাইল অ্যাপ দিয়ে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ট্র্যাকিং। সম্মেলনে বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তির সমন্বয় নিয়ে প্যানেল হয়েছে, যা NCQG (New Collective Quantified Goal) এর সাথে যুক্ত। এটি তরুণদের জলবায়ু কর্মসূচিতে প্রযুক্তির ভূমিকা তুলে ধরেছে।
২০২৫ সালে অন্যান্য সম্মেলনও প্রযুক্তির উপর ফোকাস করেছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্ভাবন সম্মেলন (ESTIC 2025) নভেম্বর ৩, ২০২৫ সালে উদ্বোধিত হয়েছে, যা উদীয়মান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপর আলোচনা করে, যার মধ্যে জলবায়ু টেকনোলজি অন্তর্ভুক্ত। এতে প্যানেল আলোচনা এবং উপস্থাপনায় AI-এর জলবায়ু মডেলিং এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবন নিয়ে কথা হয়েছে।
সিপিডির Climate Week 2025 (অক্টোবর ১৭, ২০২৫) ৬টি বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি এবং টেকসই অর্থায়ন নিয়ে ফোকাস করেছে, যা প্রযুক্তির ভূমিকা তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে জলবায়ু অর্থায়নের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনায় ক্লাইমেট স্মার্ট টেকনোলজি যেমন মিশ্র অণুজীব সারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস নিয়ে আলোচনায় সরকারী নীতিমালায় প্রযুক্তির সমন্বয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই সম্মেলনগুলোতে তরুণদের ভূমিকা এবং প্রযুক্তির সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক।
জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে প্রযুক্তির আলোচনা নির্গমন হ্রাস, অভিযোজন এবং অর্থায়নের উপর কেন্দ্রীভূত। AI-এর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, যা জলবায়ু মডেলিং এবং প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিক্সে ব্যবহৃত হয়। COP30-এর সেশনে AI-এর মাধ্যমে জলবায়ু ডেটা অ্যানালাইসিস নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা নির্গমন ১৫% কমাতে সাহায্য করতে পারে।
IoT এবং সেন্সর টেকনোলজি জলের গুণমান এবং বন্যা পূর্বাভাসে ব্যবহৃত হয়। ঢাকা সম্মেলনে IoT-ভিত্তিক প্লাস্টিক দূষণ মনিটরিং নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা শহুরে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রাসঙ্গিক। ব্লকচেইন-ভিত্তিক কার্বন ট্রেডিং Climate Week NYC-এর টপ টপিক, যা অর্থায়ন নিশ্চিত করে।
গ্রিন টেক যেমন সোলার এবং বায়োম্যানুফ্যাকচারিংয়ের উপর আলোচনা হয়েছে, যা কৃষি এবং শিল্পে প্রয়োগযোগ্য। বাংলাদেশের অংশগ্রহণে ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি এবং টেকনোলজি-ভিত্তিক অর্থায়ন নিয়ে ফোকাস করা হয়েছে।

বাংলাদেশ COP30-এর মতো সম্মেলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে, যেখানে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান NCQG এবং জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশের দাবি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রযুক্তি-ভিত্তিক অর্থায়নের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলার। ঢাকা সম্মেলনে তরুণরা IoT এবং AI-এর উপর উপস্থাপনা দিয়েছেন, যা প্লাস্টিক দূষণ এবং নগর জলবায়ু অভিযোজনে ফোকাস করেছে।
সিপিডির Climate Week 2025-এ ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি এবং টেকসই অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা বাংলাদেশের কৃষি খাতে প্রযুক্তির সমন্বয়ের উপর জোর দিয়েছে। এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে জলবায়ু টেকনোলজির গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে গেছে।
সম্মেলনগুলোতে প্রযুক্তির আলোচনা সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অ্যাক্সেসিবিলিটি অভাব যেমন উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রযুক্তির উপলব্ধতা কম। ফান্ডিং গ্যাপ এবং রেগুলেটরি বাধা প্রযুক্তির বাস্তবায়ন কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশে, জলবায়ু অর্থায়নের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনায় ক্লাইমেট স্মার্ট টেকনোলজির অভাব উল্লেখ করা হয়েছে। সমাধান: স্থানীয় অভিযোজন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
২০২৬ সালে COP31-এ প্রযুক্তির আলোচনা আরও গভীর হবে, যা AI-চালিত ক্লাইমেট অ্যাকশন এবং ব্লকচেইন-ভিত্তিক অর্থায়নের উপর ফোকাস করবে। বাংলাদেশের জন্য, ঢাকা সম্মেলনের মতো লোকাল ইভেন্টগুলো তরুণদের জড়িয়ে প্রযুক্তির সমন্বয় বাড়াবে। এই আলোচনাগুলো জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে।
জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে প্রযুক্তির আলোচনা ২০২৫ সালে জলবায়ু অ্যাকশনের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। COP30 থেকে ঢাকা সম্মেলন পর্যন্ত এই আলোচনাগুলো AI, IoT এবং গ্রিন টেকের মাধ্যমে সমাধানের পথ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এই ট্রেন্ডসকে স্থানীয় করে তুলছে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা দরকার। আরও জানতে COP30 বা CPD Climate Week চেক করুন।