18 Nov
18Nov

ভূমিকা

ডিএনএ হলো জীবনের নির্দেশনা বই। এই বইয়ে লেখা আছে কীভাবে একটি কোষ থেকে পুরো জীব তৈরি হবে, কোন রোগ হবে, এমনকি আমাদের চোখের রংও।

ডিএনএ সিকোয়েন্সিং হলো সেই বইয়ের প্রতিটি অক্ষর (A, T, C, G) একে একে পড়ার কৌশল।

১৯৭৭ সালে প্রথমবার একটি ছোট ভাইরাসের জিনোম পড়া হয়েছিল। আজ আমরা মানুষের পুরো ৩ বিলিয়ন অক্ষরের জিনোম মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পড়তে পারি—এবং খরচ মাত্র ৬০০ ডলারের নিচে!

এই প্রযুক্তি চিকিৎসা, ফরেনসিক, কৃষি এবং বিবর্তন গবেষণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

ডিএনএ সিকোয়েন্সিং-এর ইতিহাস ও প্রজন্ম

প্রজন্মসময়কালনামখরচ (মানুষের জিনোম)বৈশিষ্ট্য
প্রথম প্রজন্ম১৯৭৭-২০০৫Sanger Sequencing~৩ বিলিয়ন ডলার (২০০৩)ধীর, সঠিক, সোনার মান
দ্বিতীয় প্রজন্ম২০০৫-২০১৫Next-Generation (NGS)~১০০০ ডলার (২০১৫)সমান্তরাল, বিশাল ডেটা, সস্তা
তৃতীয় প্রজন্ম২০১৪-বর্তমানNanopore / PacBio~২০০-৬০০ ডলারলম্বা রিড, রিয়েল-টাইম, পোর্টেবল

২০০৩ সালে হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট সম্পন্ন হয় ১৩ বছরে ও ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে।

আজ ২০২৫ সালে একই কাজ হয় কয়েক ঘণ্টায় এবং কয়েকশ ডলারে।

কীভাবে কাজ করে? (সহজ ভাষায়)

১. নমুনা সংগ্রহ

রক্ত, লালা, চুল বা টিস্যু থেকে ডিএনএ বের করা হয়।

২. লাইব্রেরি তৈরি

ডিএনএ ছোট ছোট টুকরো করা হয় এবং অ্যাডাপ্টার যোগ করা হয়।

৩. সিকোয়েন্সিং

  • Illumina (NGS): লক্ষ লক্ষ টুকরো একসাথে পড়া হয়, আলোর সিগন্যাল দিয়ে।
  • Oxford Nanopore: একটি ছোট যন্ত্রে (MinION) ডিএনএ একটি ন্যানো-ছিদ্র দিয়ে টেনে নেওয়া হয়, বিদ্যুৎ প্রবাহের পরিবর্তন দিয়ে বর্ণ পড়া হয়।

৪. ডেটা বিশ্লেষণ

কম্পিউটারে বিলিয়ন বর্ণের ডেটা একত্রিত করে পুরো জিনোম তৈরি করা হয়।

ব্যবহার ক্ষেত্র

ক্ষেত্রউদাহরণ
ব্যক্তিগত চিকিৎসাক্যান্সারের টিউমারের জিনোম পড়ে সঠিক ওষুধ নির্বাচন
বংশ পরীক্ষা23andMe, AncestryDNA-এর মতো কোম্পানি
ফরেনসিকঅপরাধের দৃশ্যের ছোট্ট ডিএনএ থেকে অপরাধী শনাক্তকরণ
বিলুপ্ত প্রজাতি গবেষণাম্যামথ, ডাইনোসরের ডিএনএ পড়া
কৃষিধান, গমের উন্নত জাত তৈরি
সংক্রামক রোগকরোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট শনাক্তকরণ (Omicron, Delta)

বাংলাদেশে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং

  • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিডিডিআর,বি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ বায়োটেকনোলজিতে NGS মেশিন আছে।
  • ২০২১ সালে বাংলাদেশে প্রথম মানুষের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়।
  • করোনাকালে ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স করে ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করা হয়েছে।
  • এখনো ব্যক্তিগত জিনোম সিকোয়েন্সিং ব্যয়বহুল (৮০,০০০-১,৫০,০০০ টাকা) এবং সীমিত।

ভবিষ্যৎ: কী আসছে?

  1. ১০০ ডলারের জিনোম — ২০৩০ সালের মধ্যে সম্ভব।
  2. নবজাতকের জিনোম স্ক্রিনিং — জন্মের সময়েই সব রোগের ঝুঁকি জানা।
  3. লিকুইড বায়োপসি — রক্তে টিউমারের ডিএনএ পড়ে ক্যান্সার ধরা।
  4. জিন এডিটিং + সিকোয়েন্সিং — CRISPR দিয়ে রোগের জিন সারানো।
  5. পকেট সিকোয়েন্সার — মোবাইল ফোনের মতো ছোট যন্ত্রে মিনিটে জিনোম পড়া।

নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন

  • জিনের তথ্য কে রাখবে?
  • বীমা কোম্পানি কি জিনের কারণে বীমা দিতে অস্বীকার করবে?
  • বংশগত রোগের তথ্য জানলে মানসিক চাপ হবে কি?
  • জিনের তথ্য দিয়ে বৈষম্য হতে পারে কি?

উপসংহার

ডিএনএ সিকোয়েন্সিং শুধু একটি প্রযুক্তি নয়—এটি জীবনের কোড পড়ার চাবিকাঠি।

এই প্রযুক্তি আমাদের রোগ প্রতিরোধ, বংশ জানা, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং বিবর্তন বোঝার ক্ষমতা দিয়েছে।

আগামী দশকে এটি চিকিৎসাকে “এক আকার সবার জন্য” থেকে “আপনার জন্য তৈরি” করে দেবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি সুযোগ—যদি আমরা দ্রুত গবেষণা ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারি।জীবনের কোড এখন আমাদের হাতে। এবার সেই কোড দিয়ে আরও সুস্থ, ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার পালা।


উৎস:

  • National Human Genome Research Institute (NHGRI)
  • Illumina, Oxford Nanopore Technologies
  • বাংলাদেশ জিনোম প্রকল্প, আইসিডিডিআর,বি
  • Nature, Science জার্নাল
মন্তব্যসমূহ
* ইমেইলটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে না।