28 Oct
28Oct

ভূমিকা

জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি (গ্রিন টেক) বিনিয়োগের একটি অপরিহার্য ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে, বিশ্বব্যাপী এনার্জি ট্রানজিশন বিনিয়োগ ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১১% বৃদ্ধি। এই বিনিয়োগ ক্লিন এনার্জি, কার্বন ক্যাপচার এবং সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচারের মতো ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত, যা না শুধু অর্থনৈতিক লাভ করে, বরং গ্রহকে টেকসই করে তোলে। S&P Global-এর Top Cleantech Trends 2025 রিপোর্ট অনুসারে, ক্লিন এনার্জি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ প্রথমবারের মতো আপস্ট্রিম তেল-গ্যাস খাতকে ছাড়িয়ে যাবে, যার মধ্যে সোলার PV অর্ধেক দখল করবে।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি উচ্চ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা বিপুল, এই বিনিয়োগ স্থানীয় অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করতে পারে। J.P. Morgan-এর Q1 2025 Carbon Transition রিপোর্টে বলা হয়েছে, রিনিউয়েবল এনার্জি এবং সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সের ট্রেন্ডস এই বছরের ফোকাস। 

এই লেখায় আমরা গ্রিন টেক বিনিয়োগের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ, সাম্প্রতিক ট্রেন্ডস, উদাহরণ, চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করব। এটি ইনভেস্টর, উদ্যোক্তা এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য উপযোগী।

ক্লিন এনার্জি: বিনিয়োগের মূল স্তম্ভ

ক্লিন এনার্জি ২০২৫-এর সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ক্ষেত্র, যা সোলার PV, উইন্ড এবং হাইড্রোজেনের উপর ফোকাস করছে। S&P Global-এর রিপোর্ট অনুসারে, সোলার PV এই বিনিয়োগের অর্ধেক দখল করবে এবং নতুন ক্যাপাসিটির দুই-তৃতীয়াংশ। ২০২৪ সালে ৬২০ গিগাওয়াটেরও বেশি নতুন সোলার এবং উইন্ড ক্যাপাসিটি যোগ হয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে তিনগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে।

এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা অপার: চীনের অতিরিক্ত সরবরাহ সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মতো দেশে বৈচিত্র্যকরণ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের Inflation Reduction Act (IRA) এবং ভারতের উৎপাদন-সংযুক্ত প্রণোদনা নতুন উৎপাদন বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে, SREDA-এর লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০% নবায়নযোগ্য শক্তি, যা সোলার ফার্মে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, IDCOL-এর সোলার হোম সিস্টেম প্রোগ্রাম ৬ লক্ষ ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয়।

এনার্জি স্টোরেজ: গ্রিডের ভবিষ্যত

এনার্জি স্টোরেজ ২০২৫-এর অন্যতম হট ক্ষেত্র, যা নবায়নযোগ্য শক্তির অনিয়মিততা সমাধান করে। GreenPortfolio-এর ৫টি ক্লাইমেট টেক সেক্টরে এটি প্রথম স্থানে। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বাইরে, লং-ডিউরেশন স্টোরেজ (>৮ ঘণ্টা) দ্বিগুণ হবে। ইউরোপে সোলার প্রকল্পে স্টোরেজ ছাড়া অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মাল্টিডে স্টোরেজ টেন্ডার হবে।

বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে ৬৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি যাবে, যা পাম্পড হাইড্রোকে ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশে, যেখানে গ্রিড অস্থিরতা সমস্যা, এনার্জি স্টোরেজ ব্যাটারি স্টেশন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, ADB-এর ফান্ডিংয়ে সোলার-স্টোরেজ প্রোজেক্ট চলছে, যা ১০০ মেগাওয়াট ক্যাপাসিটি যোগ করবে। এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা ১৫-২০% ROI পেতে পারেন।

কার্বন ক্যাপচার এবং স্টোরেজ: নির্গমন হ্রাসের অস্ত্র

কার্বন ক্যাপচার এবং স্টোরেজ (CCS) ২০২৫-এর বড় বিনিয়োগ ক্ষেত্র। GreenPortfolio-এর রিপোর্টে এটি দ্বিতীয় স্থানে, যা অ্যাটমোস্ফিয়ার থেকে CO₂ ক্যাপচার করে সিন্থেটিক ফুয়েল তৈরি করে। খরচ ৬ গুণ কমলে এটি স্কেলেবল হবে, এবং ১.৫°সি লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে।

উত্তর আমেরিকায় নিম্ন খরচ এবং গ্রান্টস এই ক্ষেত্রকে লাভজনক করে তুলছে। ইউরোপের লো-কার্বন ফুয়েল নীতি CCS-কে সমর্থন করে। বাংলাদেশে, সিমেন্ট এবং টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে CCS বিনিয়োগ ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ মিলিয়ন ডলার আকর্ষণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, World Bank-এর প্রোজেক্টে CCS পাইলট চলছে, যা নির্গমন ১৫% কমাতে পারে। বিনিয়োগকারীরা এখানে ট্যাক্স ক্রেডিট এবং গ্রিন বন্ডের সুবিধা পাবেন।

সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচার: খাদ্য নিরাপত্তার চাবি

সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচার বিনিয়োগের একটি উদীয়মান ক্ষেত্র। GreenPortfolio-এর রিপোর্টে এটি তৃতীয় স্থানে, যা প্রিসিশন ফার্মিং এবং AI-চালিত ইরিগেশনের উপর ফোকাস করে। ২০২৫ সালে, এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ১৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা ফসলের উৎপাদন ২০% বাড়াতে পারে।বাংলাদেশে, যেখানে কৃষি GDP-এর ১৪% অবদান রাখে, সাসটেইনেবল অ্যাগ্রি বিনিয়োগ বন্যা-সহনশীল ফসল এবং ড্রোন মনিটরিংয়ে যাবে। IRRI-এর প্রোজেক্টে ৩০ একরে ডেমো চলছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০-১৫% রিটার্ন প্রমিস করে। উদাহরণস্বরূপ, USAID-এর Feed the Future প্রোগ্রাম ৯০০,০০০ কৃষককে সাহায্য করছে। এই ক্ষেত্রে ESG-কমপ্লায়েন্ট ফান্ডিং বাড়ছে।

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্র

ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এবং সার্কুলার ইকোনমি: বর্জ্য থেকে সম্পদ

ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ২০২৫-এর পঞ্চম বড় ক্ষেত্র। GreenPortfolio-এর রিপোর্টে এটি অন্তর্ভুক্ত, যা রিসাইক্লিং এবং জিরো-ওয়েস্ট প্রযুক্তির উপর ফোকাস করে। Emerald Technology Ventures-এর Top Climate Tech Trends 2025-এ সার্কুলারিটি প্রথম স্থানে, যা প্যাকেজিং ইনোভেশন এবং ডিজিটাল ট্রেসিংয়ে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে, যেখানে বছরে ২ লক্ষ টন প্লাস্টিক বর্জ্য, ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রোজেক্ট বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, World Bank-এর ১০০ মিলিয়ন ডলার প্রোজেক্ট ঢাকায় ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট উন্নত করছে। বিনিয়োগকারীরা এখানে ১২% ROI পেতে পারেন, বিশেষ করে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে।

গ্রিন ট্রান্সপোর্ট: মোবিলিটির টেকসই রূপ

গ্রিন ট্রান্সপোর্ট চতুর্থ ক্ষেত্র, যা ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) এবং হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের উপর ফোকাস করে। GreenPortfolio-এর রিপোর্টে এটি চতুর্থ স্থানে। ২০২৫ সালে, EV ব্যাটারি এবং চার্জিং ইনফ্রাস্ট্রাকচারে বিনিয়োগ ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

বাংলাদেশে, EV পলিসি ২০২৫-এ চার্জিং স্টেশন বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ADB-এর ৫০ মিলিয়ন ডলার লোন ঢাকায় EV ইনফ্রা তৈরি করছে। বিনিয়োগকারীরা এখানে ১৫% রিটার্ন পেতে পারেন, বিশেষ করে রিকশা-ভিত্তিক EV-তে।

AI এবং ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন: গ্রিন টেকের ব্রেইন

AI গ্রিন টেকে বিনিয়োগের একটি নতুন ক্ষেত্র। Renewable Institute-এর ২০২৫ ট্রেন্ডসে AI-এর এনার্জি হাঙ্গার উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এটি ডেকার্বোনাইজেশনে সাহায্য করবে। Emerald-এর রিপোর্টে AI-এর স্পেশালাইজেশন ইন্ডাস্ট্রি, রোবটিক্স এবং অ্যানালিটিক্সে ফোকাস করছে।

বাংলাদেশে, AI-চালিত স্মার্ট গ্রিড গবেষণা BUET-এ চলছে, যা বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, a2i-এর প্রোজেক্ট AI-এর মাধ্যমে এনার্জি ম্যানেজমেন্ট করছে। বিনিয়োগকারীরা এখানে ১৮% ROI পেতে পারেন।

চ্যালেঞ্জসমূহ: বিনিয়োগের পথে বাধা

গ্রিন টেক বিনিয়োগে চ্যালেঞ্জ যেমন উচ্চ খরচ এবং রেগুলেটরি অনিশ্চয়তা। KPMG-এর Energy Transition Outlook 2025-এ বলা হয়েছে, ৭৫% ইনভেস্টর ফসিল ফুয়েলে নিযুক্ত, যা ট্রানজিশন ধীর করে। বাংলাদেশে, অবকাঠামো এবং স্কিল গ্যাপ চ্যালেঞ্জ, কিন্তু ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক ফান্ডিং সাহায্য করছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা: ২০৩০ এবং তার পর

২০৩০ সালের মধ্যে, গ্রিন টেক বাজার ৭৩.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে, CAGR ২৩.৭% সহ। বাংলাদেশে, ২০৪১-এর ৪০% নবায়নযোগ্য লক্ষ্য ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে। Emerald-এর ট্রেন্ডস যেমন সার্কুলারিটি এবং ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ভবিষ্যতের চাবি।

উপসংহার

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ২০২৫-এর সবচেয়ে প্রমিসিং ক্ষেত্র, যা ক্লিন এনার্জি থেকে AI পর্যন্ত বিস্তৃত। S&P Global এবং BNEF-এর রিপোর্ট দেখায় যে, এই বিনিয়োগ না শুধু লাভজনক, বরং গ্রহ রক্ষায় অবদান রাখবে। বাংলাদেশে স্থানীয় সুযোগ গ্রহণ করে ইনভেস্টররা এই বিপ্লবে যোগ দিতে পারেন। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং নীতি দরকার। আজই শুরু করুন—একটি ক্ষেত্র নির্বাচন করে বিনিয়োগ করুন এবং সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ুন। আরও জানতে S&P Global বা BNEF-এর রিপোর্ট চেক করুন।

মন্তব্যসমূহ
* ইমেইলটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে না।